এমসিসিআই গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতে প্রয়োজন অর্থায়ন ব্যবস্থা ব্যবসাবান্ধব করা

দেশের বেসরকারি খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে অর্থায়ন ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ব্যবসাবান্ধব করার আহ্বান জানিয়েছেন নীতিনির্ধারক, ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী নেতারা।

তাদের মতে, দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থায়নে বৈষম্য, দুর্বল আর্থিক অবকাঠামো এবং জামানতনির্ভর ঋণ ব্যবস্থা। ব্যক্তি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজ করতে নগদ অর্থপ্রবাহ ও লেনদেনভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন, কার্যকর মুভেবল কোল্যাটেরাল রেজিস্ট্রি, ওপেন ফাইন্যান্স, ডিজিটাল তথ্যভিত্তিক অবকাঠামো, ক্রেডিট গ্যারান্টি ব্যবস্থার সংস্কার এবং বিকল্প অর্থায়নের উৎস সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক ঋণের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের নতুন উৎস তৈরি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা এবং আর্থিক খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

গতকাল মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘আ রাউন্ডটেবিল অন অ্যাকসেস টু ফাইন্যান্স ইন বাংলাদেশ: বিল্ডিং আ মোর কন্ডুসিভ ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম ফর প্রাইভেট সেক্টর’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব মতামত তুলে ধরা হয়। এতে সরকারের নীতিপ্রণেতা, আর্থিক খাতের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী ও অর্থনীতিবিদরা অংশ নেন। আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল দেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিদ্যমান পদ্ধতিগত বাধাগুলো চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের দিকনির্দেশনা তুলে ধরা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন পিডব্লিউসি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজিং পার্টনার শামস জামান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এমসিসিআইয়ের মহাসচিব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফারুক আহমেদ। এতে আরো বক্তব্য উপস্থাপন করেন মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও শাশা ডেনিমস, শাশা গার্মেন্টস এবং শাশা টেক্সটাইলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ, ব্র্যাক ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং হেড অব এসএমই ব্যাংকিং সৈয়দ আব্দুল মোমেন।

মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, ‘দেশে অর্থায়নে প্রবেশাধিকারে বৈষম্য রয়েছে। কিছু ব্যক্তি ও খাত সহজে অর্থায়ন পেলেও অনেকেই প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হন। শুধু ঋণগ্রহীতা নয়, আমানতকারীদের মধ্যেও বিনিয়োগের উপযুক্ত মাধ্যম সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। তাই অর্থায়ন ও ব্যাংকিং সেবায় সবার জন্য প্রবেশাধিকার আরো বিস্তৃত করতে হবে।’

শামস জামান বলেন, ‘বাংলাদেশ বিজনেস ক্লাইমেট ইনডেক্সে অর্থায়নে প্রবেশাধিকারের স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ৪০, যা সূচকের সাতটি স্তম্ভের মধ্যে সর্বনিম্ন। উদ্যোক্তাদের জন্য মূলধন সংগ্রহই বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা।’ তিনি বলেন, ‘আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়লেও ঋণপ্রাপ্তি সেই অনুপাতে বাড়েনি। শুধু ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ওয়ালেট থাকলেই কার্যকর অর্থায়ন নিশ্চিত হয় না। একই সঙ্গে বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থার প্রধান দুর্বলতা একটি কার্যকর আর্থিক অবকাঠামোর অভাব।’ তিনি কার্যকর মুভেবল কোলাটেরাল রেজিস্ট্রি, ওপেন ফাইন্যান্স, রিসিভেবলস ও সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স, ক্রেডিট গ্যারান্টি ব্যবস্থার পুনর্গঠন, গভীর বন্ড বাজার এবং ঝুঁকিভিত্তিক ইকুইটি অর্থায়নের পরিবেশ গড়ে তোলার সুপারিশ করেন।

সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, ‘সরবরাহ শৃঙ্খল ও ডিস্ট্রিবিউটর ফাইন্যান্সিংয়ে তারল্য সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। ডিস্ট্রিবিউটরদের ব্যবসায়িক লেনদেন ও হিসাবকে ঋণ মূল্যায়নের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করলে জামানত ছাড়াই অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো সম্ভব।’

সৈয়দ আব্দুল মোমেন বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে ব্যাংক খাতের অর্থায়নের বড় অংশ করপোরেট খাতে গেলেও এসএমই খাত ব্যাংকগুলোর সমস্যার জন্য দায়ী নয়। তার দাবি, ব্র্যাক ব্যাংকের প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার জামানতবিহীন এসএমই ঋণে খেলাপির হার মাত্র ২ শতাংশ, অথচ জামানতযুক্ত ঋণে খেলাপির হার আরো বেশি। ফলে শুধু জামানতের ওপর নির্ভর করে ঋণের ঝুঁকি নির্ধারণের প্রচলিত ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।’

শামস মাহমুদ বলেন, ‘অর্থায়নে প্রবেশাধিকারের সমস্যা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু ঋণপ্রাপ্তির বিষয় নয়, দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাত, ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং ২০২৪ সালের পর সৃষ্ট কাঠামোগত পরিবর্তনও বিবেচনায় নিতে হবে।’

আরও